ঠান্ডা না হওয়ার কারণ ও সমাধানের সহজ উপায়

ফ্রিজের কুলিং প্রবলেম? ঠান্ডা না হওয়ার কারণ ও সমাধানের সহজ উপায়গুলো জেনে নিন 

গরমের তীব্রতার মধ্যে হুট করে যদি দেখেন বাসার ফ্রিজটি ঠিকমতো ঠান্ডা হচ্ছে না, তবে দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। মাছ, মাংস, দুধ বা শাকসবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকেই তখন প্যানিক করতে শুরু করেন এবং দ্রুত মেকানিক খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু ফ্রিজ ঠান্ডা না হলেই যে বড় কোনো সমস্যা হয়েছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই।

অনেক সময় খুব ছোট এবং সাধারণ কিছু ভুলের কারণেও ফ্রিজ ঠান্ডা হওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। এই সমস্যাগুলোর বেশিরভাগই আপনি নিজে ঘরে বসে কোনো খরচ ছাড়াই ঠিক করে নিতে পারেন। আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব রেফ্রিজারেটর ঠান্ডা না হওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো কী কী এবং ঘরে বসেই কীভাবে এর সমাধান করা সম্ভব।

ফ্রিজ ঠান্ডা না হওয়ার ৬টি কারণ ও সমাধান

ফ্রিজ ঠান্ডা না হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। নিম্নে কারণগুলো সমাধানসহ আলোচনা করা হল- 

১. ভুল তাপমাত্রা নির্ধারণ (Incorrect Temperature Settings)

ফ্রিজ ঠান্ডা না হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রাথমিক কারণ হলো এর ভেতরে থাকা থার্মোস্ট্যাট বা টেম্পারেচার সেটিংসে গড়মিল হওয়া। ফ্রিজ পরিষ্কার করার সময় কিংবা অসাবধানতাবশত ভেতরের রেগুলেটর বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রক নবটি ঘুরে কমের দিকে চলে যেতে পারে। এছাড়া আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে সাথে ফ্রিজের তাপমাত্রাও যে পরিবর্তন করতে হয়, তা আমরা অনেকেই ভুলে যাই।

সমাধান: মেকানিক ডাকার আগে প্রথমেই ফ্রিজের ভেতরের টেম্পারেচার সেটিংস চেক করুন। গরমের দিনে ফ্রিজের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে (অর্থাৎ কুলিং লেভেল হাই করে) দিতে হয়। সাধারণত ডিজিটাল ফ্রিজের ক্ষেত্রে নরমাল অংশের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা হলো ৩° থেকে ৪° সেলসিয়াস এবং ডিপ বা ফ্রিজারের জন্য -১৮° সেলসিয়াস। যদি এনালগ নব থাকে, তবে গরমের সময় সেটি মাঝারি বা উচ্চ পজিশনে (যেমন ৪ বা ৫ নম্বরে) সেট করুন।

২. দরজার রাবার বা গ্যাসকেটের সমস্যা (Faulty Door Gasket)

ফ্রিজের দরজা ভালোভাবে আটকে রাখার জন্য দরজার চারপাশে একটি চৌম্বকীয় রাবার স্ট্রিপ থাকে, যাকে Gasket বলা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এই রাবারটি ঢিলে হয়ে যেতে পারে, ফেটে যেতে পারে কিংবা ময়লা জমে এর আঠালো ভাব কমে যেতে পারে। গ্যাসকেট যদি ঠিকমতো সিল না হয়, তবে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস বাইরে বের হয়ে যায় এবং বাইরের গরম বাতাস ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে ফ্রিজ অনবরত চলেলেও তার কাঙ্ক্ষিত ঠান্ডা বজায় রাখতে পারে না।

সমাধান: একটি সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে আপনি এটি নিশ্চিত করতে পারেন। ফ্রিজের দরজার মাঝে একটি কাগজ বা টাকার নোট রেখে দরজাটি বন্ধ করুন। এবার কাগজটি টেনে বের করার চেষ্টা করুন। যদি কাগজটি খুব সহজেই কোনো বাধা ছাড়া বের হয়ে আসে, তবে বুঝবেন দরজার রাবারটি ঢিলে হয়ে গেছে। রাবারে ময়লা থাকলে কুসুম গরম পানি ও ডিশ ওয়াশার দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করে নিন। আর রাবার যদি নষ্ট বা ফেটে যায়, তবে বাজার থেকে নতুন গ্যাসকেট কিনে এনে তা বদলে নিতে হবে।

৩. অতিরিক্ত খাবার রাখা এবং এয়ার ভেন্ট বন্ধ হওয়া (Overstuffing)

আমাদের অনেকেরই অভ্যাস থাকে ফ্রিজে গাদাগাদি করে খাবার রাখা। ফ্রিজের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি খাবার রাখলে ফ্রিজের ভেতরের ঠান্ডা বাতাস চলাচলের পথ বা এয়ার ভেন্টগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রিজের ভেতরে কোল্ড এয়ার সার্কুলেশন বা ঠান্ডা বাতাস অনবরত ঘুরতে না পারলে কোনো খাবারই ঠিকমতো ঠান্ডা হবে না। বিশেষ করে ডিপ ফ্রিজে যদি ভেন্টের সামনে বড় কোনো বক্স বা মাংসের প্যাকেট রেখে দেওয়া হয়, তবে পুরো ফ্রিজের কুলিং সিস্টেম ব্যাহত হয়।

সমাধান: ফ্রিজ সবসময় পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখুন। ফ্রিজের দেয়ালের পাশে বা এয়ার ভেন্টের ঠিক সামনে বড় কোনো পাত্র বা প্যাকেট রাখবেন না। ফ্রিজের ধারণক্ষমতার অন্তত ২০% জায়গা ফাঁকা রাখার চেষ্টা করুন, যেন ঠান্ডা বাতাস সব কোণায় সমানভাবে পৌঁছাতে পারে।

৪. কনডেন্সার কয়েলে ময়লা ও ভেন্টিলেশনের অভাব

ফ্রিজের পেছনে বা নিচের দিকে কিছু প্যাঁচানো কয়েল বা পাইপ থাকে, যেগুলোকে ‘কনডেন্সার কয়েল’ বলা হয়। ফ্রিজের ভেতরের গরম বাতাস বাইরে বের করে দেওয়ার মূল কাজটি করে এই কয়েল। যেহেতু এই অংশটি বাইরের দিকে থাকে, তাই খুব দ্রুত এতে ঝুল, ধুলাবালি বা মাকড়সার জাল জমে একটি আস্তরণ তৈরি হয়। কনডেন্সার কয়েলে ময়লার স্তর জমে গেলে এটি ফ্রিজের ভেতরের তাপ বাইরে ছাড়তে পারে না, যার ফলে কম্প্রেশরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং ফ্রিজ ঠান্ডা হওয়া বন্ধ করে দেয়।

এছাড়া, আমরা অনেকেই ঘরের জায়গা বাঁচানোর জন্য ফ্রিজকে দেয়ালের সাথে একদম লাগিয়ে রাখি। পেছনের কয়েল থেকে যে গরম বাতাস বের হয়, তা ঘরের বাতাসে মিশে যাওয়ার জন্য কিছুটা ফাঁকা জায়গার প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন না থাকলে ফ্রিজ দ্রুত গরম হয়ে যায়।

সমাধান: বছরে অন্তত দুইবার ফ্রিজের কনডেন্সার কয়েল পরিষ্কার করা উচিত। ফ্রিজের মেইন পাওয়ার প্লাগটি খুলে সাবধানে ফ্রিজটি দেয়াল থেকে সরিয়ে আনুন। এরপর একটি নরম ব্রাশ বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে কয়েলে জমে থাকা সমস্ত ধুলাবালি আলতো করে পরিষ্কার করে নিন। পরিষ্কার করার পর দেয়াল থেকে ফ্রিজের পেছনের অংশ অন্তত ৬ থেকে ১০ ইঞ্চি ফাঁকা রেখে স্থাপন করুন।

সতর্কতা: কনডেন্সার কয়েল পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই ফ্রিজের মেইন পাওয়ার সুইচ বন্ধ করে প্লাগ খুলে নেবেন। কোনো অবস্থাতেই ভেজা কাপড় বা পানি ব্যবহার করবেন না।

৫. ডিফ্রস্ট সিস্টেমের ত্রুটি ও বরফ জমে যাওয়া

আধুনিক No-Frost ফ্রিজগুলোতে একটি অটো-ডিফ্রস্ট সিস্টেম থাকে, যা নির্দিষ্ট সময় পর পর ফ্রিজের ভেতরের অতিরিক্ত বরফ গলিয়ে ফেলে। কোনো কারণে যদি ডিফ্রস্ট টাইমার, হিটার বা থার্মাল ফিউজ নষ্ট হয়ে যায়, তবে ইভাপোরেটর কয়েলের ওপর অতিরিক্ত বরফের আস্তরণ জমে যায়। এই অতিরিক্ত বরফ ভেতরের ফ্যানটিকে ব্লক করে দেয়, যার ফলে ডিপ ফ্রিজে বরফ জমলেও নরমাল অংশে ঠান্ডা বাতাস পৌঁছাতে পারে না।

সমাধান: ফ্রিজের ভেতর থেকে যদি অদ্ভুত কোনো আওয়াজ আসে বা ফ্যান চলার শব্দ না পাওয়া যায়, তবে বুঝতে হবে বরফ জমে ফ্যান লক হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে মেকানিক ডাকার আগে ফ্রিজটি সম্পূর্ণ খালি করে মেইন পাওয়ার প্লাগটি খুলে দিন। ফ্রিজের দরজা খোলা রেখে ২৪ ঘণ্টার জন্য এটি বন্ধ (Defrost) করে রাখুন, যেন ভেতরের সব লুকানো বরফ গলে পানি হয়ে বের হয়ে যায়। এরপর ফ্রিজটি ভালো করে মুছে আবার চালু করে দেখুন। অনেক সময় এই সাধারণ ডিফ্রস্টিংয়েই বড় সমস্যা সমাধান হয়ে যায়।

৬. পাওয়ার সাপ্লাই ও ভোল্টেজের সমস্যা

ফ্রিজ ঠান্ডা না হওয়ার আরেকটি অন্যতম বড় কারণ হতে পারে আপনার বাসার বিদ্যুৎ সরবরাহ বা ভোল্টেজ এর ওঠানামা । ফ্রিজের কম্প্রেশরটি চালু হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং স্থিতিশীল ভোল্টেজের প্রয়োজন হয়। যদি ভোল্টেজ প্রয়োজনের চেয়ে কম থাকে, তবে কম্প্রেশরটি স্টার্ট নিতে পারে না। ফ্যান বা লাইট জ্বললেও ফ্রিজ ঠান্ডা হয় না।

সমাধান: আপনার এলাকায় যদি ঘন ঘন ভোল্টেজ ওঠানামা করার সমস্যা থাকে, তবে ফ্রিজের সুরক্ষায় একটি ভালো মানের ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা উচিত। যদিও আধুনিক ইনভার্টার ফ্রিজগুলোতে বিল্ট-ইন স্ট্যাবিলাইজার থাকে, তবুও অতিরিক্ত ভোল্টেজ ড্রপের ক্ষেত্রে বাহ্যিক স্ট্যাবিলাইজার ফ্রিজের কম্প্রেশরকে সুরক্ষিত রাখে।

কখন বুঝবেন টেকনিশিয়ানের সাহায্য প্রয়োজন?

কিছু সমস্যা আপনি নিজে পরিষ্কার বা সেটিংস পরিবর্তনের মাধ্যমে ঠিক করতে পারলেও, নিচের পরিস্থিতিগুলোতে অবশ্যই প্রফেশনাল মেকানিক বা আফটার-সেলস সার্ভিসের সাহায্য নিতে হবে:

১. গ্যাস লিক হলে (Refrigerant Leak): ফ্রিজের ভেতরে ফ্যান বা কম্প্রেশর সচল থাকার পরও যদি বাতাস মোটেও ঠান্ডা না হয়, তবে বুঝতে হবে ফ্রিজের গ্যাস লিক হয়েছে বা কমে গেছে। এটি গ্যাস রিফিল ছাড়া ঠিক হবে না।

২. কম্প্রেশর বা রিলে নষ্ট হলে: ফ্রিজের পাওয়ার অন করার পরও যদি পেছনের কম্প্রেশর থেকে কোনো মৃদু গুঞ্জন শব্দ না আসে, অথবা কম্প্রেশরটি অতিরিক্ত গরম হয়ে কিছুক্ষণ পর পর ‘ক্লিক’ শব্দ করে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে এর পার্টস নষ্ট হয়েছে।

৩. মাদারবোর্ড বা সেন্সর বিকল হলে: আধুনিক ডিজিটাল ফ্রিজের সার্কিট বোর্ড বা সেন্সর নষ্ট হলে ফ্রিজ সঠিক সিগন্যাল পায় না। এগুলো মেরামতের জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ানের প্রয়োজন।

পরিশেষ

একটি রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ দীর্ঘদিন ভালো রাখার মূল চাবিকাঠি হলো এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ। নিয়মিত ফ্রিজ পরিষ্কার রাখা, অতিরিক্ত খাবার না ঠাসা এবং দেয়াল থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখার মতো সাধারণ অভ্যাসগুলো মেনে চললে ফ্রিজ সহজে নষ্ট হয় না। মেকানিক ডেকে বড় অংকের টাকা খরচ করার আগে এই সাধারণ কারণগুলো একবার মিলিয়ে দেখুন। আপনার মূল্যবান হোম অ্যাপ্লায়েন্সের সঠিকভাবে যত্ন নিন। দৈনন্দিন জীবনের নানা দরকারি গ্যাজেট গাইডের সঠিক তথ্য এবং আধুনিক প্রযুক্তির আপডেট পেতে অ্যাপল গ্যাজেটস এর সাথেই থাকুন।

Similar Posts