ভালো এসি চেনার সহজ ৬টি উপায়

ভালো এসি চেনার সহজ ৬টি উপায়: কেনার আগে যা জানা জরুরি

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে  স্বস্তি পেতে আজকাল এসি বা এয়ার কন্ডিশনার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি প্রয়োজনীয় অংশে পরিণত হয়েছে। তবে সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা বাজার ঘুরে একটি এসি কিনতে যাই। শোরুমে ঢুকলে বিক্রেতারা তাদের প্রতিটি এসিকেই সেরা বলে দাবি করেন এবং হরেক রকম টেকনিক্যাল টার্ম ছুড়ে দেন, আপনি কিছু না বুঝেই মাথা নাড়েন। আর শেষমেশ আপনার কষ্টার্জিত টাকায় হয়তো ভুল বা নিম্নমানের এসি কিনে বাড়ি ফেরেন তারপর প্রতিমাসে বিদ্যুৎ বিল দেখে মাথায় হাত!

একটি ভালো এসি চেনার জন্য আপনাকে বেশি কিছু জানতে হবে না। এসির কিছু বেসিক ফিচার এবং আপনার রুমের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলেই আপনি নিজেই আপনার জন্য সঠিক  এসি চিনে নিতে পারবেন। আজকের ব্লগে আমরা একদম সহজ ভাষায় একটি ভালো এসি চেনার আসল উপায়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করব। 

ভালো এসি চেনার সহজ ৬টি উপায়

ভালো এসি চেনার বেশ কয়েকটি উপায় আছে, তবে আজকে সহজ কিছু উপায় নিম্নে আলোচনা করা হলো- 

১. ইনভার্টার নাকি নন-ইনভার্টার?

ভালো এসি চেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রথম এবং প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো এর কম্প্রেসারের প্রযুক্তি। বর্তমানে বাজারে দুই ধরনের প্রযুক্তির এসি পাওয়া যায় যথাক্রমে- ইনভার্টার এবং নন-ইনভার্টার

ইনভার্টার এসি (Inverter AC): ইনভার্টার এসি ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী কম্প্রেসারের গতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ঘর পর্যাপ্ত ঠান্ডা হয়ে গেলে কম্প্রেসারটি পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে কম গতিতে চলতে থাকে। যার ফলে এটি ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে পাশাপাশিঘরের তাপমাত্রা একভাবে বজায় রাখে এবং শব্দ অনেক কম হয়।

নন-ইনভার্টার এসি (Non-Inverter AC): নন-ইনভার্টার এসির কম্প্রেশর হয় পুরোপুরি ফুল স্পিডে চলে, না হয় বন্ধ হয়ে যায়। ঘর ঠান্ডা হলে এটি বন্ধ হয় এবং তাপমাত্রা একটু বাড়লেই আবার ফুল স্পিডে চালু হয়। এই বারবার অন-অফ হওয়ার কারণে এটি প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় করে।

চেনার উপায়: আপনি যদি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল বাঁচাতে চান, তবে চোখ বন্ধ করে ইনভার্টার এসি বেছে নেওয়া উচিত। এসির বডিতে বা স্পেসিফিকেশন শিটে ‘Digital Inverter’ বা ‘Inverter’ লেখা দেখে এটি নিশ্চিত হয়ে নিন।

২. কন্ডেন্সার কয়েল: কপার নাকি অ্যালুমিনিয়াম? 

এসির স্থায়িত্ব এবং দ্রুত ঘর ঠান্ডা করার ক্ষমতা নির্ভর করে এর ভেতরে থাকা কন্ডেন্সার কয়েলের ওপর। এসির কয়েল দুই ধরণের মেটেরিয়ালের হয়- কপার (তামা) এবং অ্যালুমিনিয়াম। একটি ভালো এবং টেকসই এসি চেনার অন্যতম সেরা উপায় হলো এতে ১০০% কপার কয়েল আছে কি না তা যাচাই করা। 

কপারের সুবিধা: কপার কয়েলের তাপ পরিবাহিতা অনেক বেশি, ফলে ঘর খুব দ্রুত ঠান্ডা হয়। এটি সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না, গ্যাস লিক হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে এবং কোনো সমস্যা হলে খুব সহজে মেরামত করা যায়।

অ্যালুমিনিয়ামের সীমাবদ্ধতা: অ্যালুমিনিয়াম কয়েল সস্তা হলেও এটি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, মরিচা পড়ে এবং লিক হলে সাধারণত মেরামত করা যায় না, পুরো কয়েলটাই বদলে ফেলতে হয়।

Gold Fin / Blue Fin প্রযুক্তি: ভালো মানের এসিগুলোতে কপার কয়েলের ওপর একটি বিশেষ অ্যান্টি-করোসিভ কোটিং বা প্রলেপ দেওয়া থাকে, যাকে ‘Gold Fin‘ বা ‘Blue Fin‘ প্রযুক্তি বলা হয়। এটি এসিকে লবণাক্ত বাতাস, বৃষ্টি এবং ধুলাবালি থেকে রক্ষা করে মরিচা পড়া রোধ করে।

আরও পড়ুন- বাসা বাড়িতে ব্যাবহারের জন্য ৫টি ভালো এসি

৩. রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস: R32 কেন এগিয়ে?

এসি বাতাসকে ঠান্ডা করার জন্য এক ধরণের বিশেষ গ্যাস ব্যবহার করে, যাকে রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস বলা হয়। ভালো মানের আধুনিক এসি চেনার জন্য এর ভেতরে কোন ধরনের গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে নিন।

R32 গ্যাস: এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব গ্যাস। এর ওজোন স্তর ক্ষয়ের ক্ষমতা শূন্য এবং এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে ঘর ঠান্ডা করতে পারে। R32 গ্যাসযুক্ত এসিগুলো কম বিদ্যুৎ খরচ করে বেশি কুলিং পারফরম্যান্স দেয়।

R410A গ্যাস: এটিও নিরাপদ, তবে R32-এর তুলনায় এর কুলিং কার্যক্ষমতা কিছুটা কম।

R22 গ্যাস: এটি একটি পুরনো প্রযুক্তি যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আধুনিক ভালো এসিগুলোতে এখন আর এই গ্যাস ব্যবহার করা হয় না।

৪. Star Rating: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সার্টিফিকেট

এসির ইনডোর ইউনিটের গায়ে একটি চার্ট বা কালারফুল স্টিকার লাগানো থাকে যেখানে ১ থেকে ৫টি স্টার বা তারকা চিহ্ন দেওয়া থাকে। এটিকে বলা হয় এনার্জি Star Rating । ভালো এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এসি চেনার এটি একটি আন্তর্জাতিক সহজ মাধ্যম।

এসির স্টার রেটিং যত বেশি হবে (যেমন ৪-স্টার বা ৫-স্টার), সেই এসি তত বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে। একটি ৫-স্টার রেটিংযুক্ত ইনভার্টার এসি ১-স্টার এসির তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ খরচ করে। তাই কেনার সময় এসির গায়ে থাকা এই রেটিং স্টিকারটি অবশ্যই খেয়াল করবেন।

৫. রুমের সাইজ এবং টনের সঠিক কম্বিনেশন

একটি ভালো এসি তখনই ভালো পারফর্ম করবে যখন সেটি আপনার রুমের সাইজ অনুযায়ী কেনা হবে। রুমের তুলনায় ছোট এসি কিনলে ঘর ঠিকমতো ঠান্ডা হবে না এবং কম্প্রেসারের  ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।

রুমের সাইজ অনুযায়ী টনের সঠিক কম্বিনেশনের  হিসাবটি নিচে দেওয়া হলো:

  •   ১০০ — ১২০ স্কয়ার ফিট: ১ টন (১২,০০০ BTU) এসির প্রয়োজন।
  •   ১২১ — ১৮০ স্কয়ার ফিট: ১.৫ টন (১৮,০০০ BTU) এসি সবচেয়ে উপযোগী।
  •   ১৮১ — ২৪০ স্কয়ার ফিট: ২ টন (২৪,০০০ BTU) এসি লাগবে।

বিশেষ নোট: আপনার ঘরটি যদি একদম উপরের তলায় (ছাদের নিচে) হয়, অথবা ঘরে যদি সরাসরি দুপুরের কড়া রোদ আসে, তবে হিসাবের চেয়ে কিছুটা বেশি ক্ষমতার (যেমন ১.৫ টনের জায়গায় ২ টন) এসি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

আরও পড়ুন- এসির কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে ৫টি টিপস

৬. কিছু দরকারি এক্সট্রা ফিচার যা খেয়াল রাখবেন

একটি আধুনিক ভালো মানের এসি শুধু ঘর ঠান্ডাই করে না, বরং ঘরের পরিবেশকে আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর রাখতে কিছু অতিরিক্ত ফিচার অফার করে:

এয়ার ফিল্টারিং (PM 2.5 Filter): এই ফিল্টারগুলো বাতাসের অতি সূক্ষ্ম ধুলাবালি, ব্যাকটেরিয়া এবং অ্যালার্জেন দূর করে ঘরের বাতাসকে বিশুদ্ধ রাখে, যা ঘরে থাকা শিশু বা বয়স্কদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা থেকে বাঁচায়।

অটো ক্লিন টেকনোলজি (Auto Clean): এই ফিচারটি অন করলে এসির ভেতরের জমে থাকা আর্দ্রতা এবং ধুলাবালি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিষ্কার হয়ে যায়, ফলে এসির ভেতরে ফাঙ্গাস বা ছত্রাক জমতে পারে না। 

নয়েজ লেভেল (Noise Level): ভালো এসির ইনডোর ইউনিট চলার সময় খুব কম শব্দ করে (Ideally ৩০ ডেসিবেল বা তার নিচে)। নয়েজ লেভেল যত কম হবে, আপনার ঘুম তত আরামদায়ক হবে।

আপনার জন্য কোন ধরনের এসি পারফেক্ট

  • বাজেট যদি কম হয় এবং দিনে মাত্র ২-৩ ঘণ্টা ব্যবহার করেন তাহলে আপনি স্ট্যান্ডার্ড নন-ইনভার্টার এসি নিতে পারেন, কারণ এর প্রাথমিক কেনা দাম কম।
  • দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বা তার বেশি ব্যবহার করলে, আপনার জন্য ৫-স্টার রেটিংযুক্ত ইনভার্টার এসি একটি পারফেক্ট চয়েস। এটি প্রথম দিকে কিনতে খরচ বেশি হলেও কয়েক মাসের বিদ্যুৎ বিলে সেই টাকা উসুল করে দেবে।
  • উপকূলীয় বা অতিরিক্ত ধুলাবালি যুক্ত এলাকায় থাকলে, আপনাকে এমন এসি বেছে নিতে হবে যাতে ১০০% কপার কয়েল এবং গোল্ড ফিন কোটিং রয়েছে, যা মরিচা পড়া থেকে এসিকে বাঁচাবে।

পরিশেষ

সংক্ষেপে বলতে গেলে, একটি ভালো এসি শুধু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নামের ওপর নির্ভর করে না। বরং আপনার রুমের আকার অনুযায়ী সঠিক ক্ষমতা, ১০০% কপার কয়েল, আধুনিক ইনভার্টার প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব R32 গ্যাসের সমন্বয়ই নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহার। এসি একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, তাই কেনার সময় তাড়াহুড়ো না করে এই টেকনিক্যাল বিষয়গুলো শোরুমের ক্যাটালগ বা এসির বডিতে থাকা স্টিকার থেকে মিলিয়ে নিন। সেই সাথে ব্র্যান্ডের কম্প্রেশর ওয়ারেন্টি (সাধারণত ১০ বছর) এবং তাদের আফটার-সেলস সার্ভিস কেমন, তা জেনে নেওয়া জরুরি। আধুনিক জীবনের নানাবিধ গ্যাজেট এবং হোম অ্যাপ্লায়েন্সের সঠিক বাইং গাইড ও প্রযুক্তির নিত্যনতুন আপডেট পেতে অ্যাপল গ্যাজেটস ব্লগের সাথেই থাকুন।

Similar Posts