চার্জার ফ্যান কতক্ষণ চার্জ দিতে হয়

চার্জার ফ্যান কতক্ষণ চার্জ দিতে হয়? জেনে নিন চার্জ  দেওয়ার সঠিক নিয়ম 

প্রচণ্ড গরমে লোডশেডিংয়ের সময় চার্জার ফ্যান আমাদের পরম বন্ধু। কিন্তু সঠিক নিয়ম না জানার কারণে অনেক সময় দামী এই ফ্যানের ব্যাটারি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। আমরা অনেকেই দ্বিধায় থাকি যে চার্জার ফ্যান কতক্ষণ চার্জ দিতে হয় কিংবা চার্জে থাকা অবস্থায় ফ্যান চালানো যাবে কি না। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একটি ভালো মানের ফ্যানও কয়েক মাসের মধ্যে অকেজো হতে পারে। আজকের ব্লগে আমরা চার্জার ফ্যান চার্জ দেওয়ার সঠিক নিয়ম এবং ব্যাটারি দীর্ঘস্থায়ী রাখার পরীক্ষিত উপায়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

চার্জার ফ্যানের স্থায়িত্ব ও ব্যাটারির গুরুত্ব

একটি চার্জার ফ্যান কতটা ভালো সার্ভিস দেবে তা পুরোপুরি নির্ভর করে এর ব্যাটারি হেলথের ওপর। আমাদের দেশের বাজারে সাধারণত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিচালিত চার্জার ফ্যানগুলোই বেশি দেখা যায়। এই ব্যাটারিগুলো বেশ সংবেদনশীল এবং এগুলো নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। আপনি যদি সঠিক সময়ে চার্জ না দেন কিংবা ব্যাটারিকে অবহেলা করেন, তবে খুব দ্রুতই এর চার্জ ধরে রাখার ক্ষমতা কমে যাবে। সাধারণত দেখা যায়, একটি নতুন ফ্যান শুরুতে ৫-৬ ঘণ্টা ব্যাকআপ দিলেও কয়েক মাস পর তা মাত্র ১ ঘণ্টায় নেমে আসে। এই সমস্যার মূল কারণ হলো ভুল পদ্ধতিতে চার্জ দেওয়া। তাই একটি চার্জার ফ্যান দীর্ঘদিন সচল রাখতে হলে এর ব্যাটারির বৈশিষ্ট্য এবং চার্জিং এর নিয়মগুলো ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন।

নতুন চার্জার ফ্যান প্রথমবার চার্জ দেওয়ার নিয়ম

নতুন একটি চার্জার ফ্যান যখন আমরা বাজার থেকে কিনে আনি, তখন এর ব্যাটারি inactive অবস্থায় থাকে। কারখানায় চার্জ দেওয়ার পর সেটি কন্টেইনারে বা দোকানের তাকে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে। ফলে ব্যাটারির ভেতরের কেমিক্যালগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তাই ফ্যানটি প্যাকেট থেকে খোলার পর প্রথম কাজই হলো চার্জ দেওয়া। 

অনেকেই নতুন ফ্যান কিনে এনেই সেটি চালিয়ে চেক করতে শুরু করেন এবং চার্জ শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালান। এটি ব্যাটারির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নিয়ম হলো, নতুন ফ্যান ব্যবহারের আগে সেটিকে একটানা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা চার্জে দিয়ে রাখা। 

এই দীর্ঘ সময়ের চার্জিং ব্যাটারির সেলগুলোকে পুরোপুরি সক্রিয় করে এবং এর ইলেকট্রন প্রবাহকে স্বাভাবিক করে তোলে। এই প্রথমবার চার্জ দেওয়ার সময় ভুলেও ফ্যান চালানো উচিত নয়। মনে রাখবেন, প্রথম চার্জিং পিরিয়ডটি যদি সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, তবে আপনার ব্যাটারির আয়ু শুরুতেই অনেকটা বেড়ে যায়।

চার্জার ফ্যান কতক্ষণ চার্জ দিতে হয়?

স্বাভাবিক ব্যবহারের সময় আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে প্রতিদিনের জন্য চার্জার ফ্যান কতক্ষণ চার্জ দিতে হয়? এই বিষয়টি মূলত নির্ভর করে আপনার ফ্যানের ব্যাটারি কত এম্পিয়ারের (Ah) এবং সেটি কতটুকু ব্যবহৃত হয়েছে তার ওপর। তবে গড়পড়তা হিসেবে, একটি মাঝারি সাইজের চার্জার ফ্যান পুরোপুরি চার্জ হতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় নেয়।

আপনার ফ্যানটি যদি স্মার্ট ফিচারের হয়, তবে সেখানে ইন্ডিকেটর লাইট থাকবে। সাধারণত চার্জ হওয়ার সময় লাল বাতি জ্বলে এবং চার্জ হয়ে গেলে সেটি সবুজ বা নীল রঙ ধারণ করে। বাতির রঙ পরিবর্তন হওয়া মাত্রই চার্জিং প্লাগ খুলে ফেলা উচিত। 

অনেক সময় আমরা মনে করি যত বেশি চার্জ দেব, তত বেশি ব্যাকআপ পাব যা একটি ভুল ধারণা। অতিরিক্ত চার্জ বা ‘ওভারচার্জিং’ করলে ব্যাটারি গরম হয়ে ফুলে যায় এবং এর অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব কমে যায়। তাই ৮ ঘণ্টার বেশি সময় কোনো অবস্থাতেই ফ্যান চার্জে রাখা উচিত নয়।

আরও পড়ুন- সেরা মিনি পোর্টেবল ফ্যান

ডিপ ডিসচার্জের ঝুঁকি

চার্জার ফ্যান ব্যবহারের সময় আমরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করি তা হলো ব্যাটারি একদম শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফ্যান চালানো। লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি যদি একবার পুরোপুরি ‘জিরো’ হয়ে যায়, তবে এর সেলগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একে টেকনিক্যাল ভাষায় ‘ডিপ ডিসচার্জ’ বলা হয়।

যখন দেখবেন ফ্যানের বাতাসের গতি কমতে শুরু করেছে কিংবা লাইট থাকলে সেটির আলো আবছা হয়ে আসছে, তখনই বুঝবেন ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সময় হয়েছে। ব্যাটারি ২০-৩০ শতাংশ চার্জ থাকাকালীন অবস্থায় চার্জ দেওয়া সবচেয়ে আদর্শ নিয়ম। ব্যাটারি পুরোপুরি শেষ করে চার্জ দিলে সেটি পূর্ণ হতে অনেক বেশি সময় নেয় এবং ধীরে ধীরে এর কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। তাই বাতাস একদম বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সচেতনভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর চার্জ দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। 

চার্জে থাকা অবস্থায় ফ্যান চালানোর কুফল

লোডশেডিংয়ের সময় হয়তো কারেন্ট আসল, কিন্তু আপনার ফ্যানের চার্জও শেষ। এমন অবস্থায় আমরা অনেকেই চার্জার প্লাগ লাগিয়ে ফ্যান হাই স্পিডে চালিয়ে দিই। আপাতদৃষ্টিতে এটি সুবিধাজনক মনে হলেও ব্যাটারির জন্য এটি একটি ‘সাইলেন্ট কিলার’।

যখন একটি ফ্যান চার্জ হয়, তখন ব্যাটারির ভেতরে রাসায়নিক শক্তি জমা হতে থাকে। ঠিক একই সময়ে যদি আপনি ফ্যানটি চালান, তবে ব্যাটারিকে একই সাথে চার্জ গ্রহণ করতে এবং চার্জ খরচ করতে হয়। এই দ্বিমুখী চাপের ফলে ব্যাটারির ভেতরে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। অতিরিক্ত তাপ ব্যাটারির কেমিক্যাল প্যানেলগুলোকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে দেখা যায়, কয়েক মাস পর ফ্যানটি কেবল কারেন্ট থাকলেই চলে, কারেন্ট চলে গেলে আর ব্যাকআপ দেয় না। যদি একান্তই চালাতে হয়, তবে চার্জে দিয়ে ফ্যানের স্পিড খুব কমিয়ে রাখুন, তবে দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য চার্জিং অবস্থায় ফ্যান না চালানোই সবচেয়ে ভালো। 

আরও পড়ুন- কোন ব্র্যান্ডের চার্জার ফ্যান ভালো?

অফ-সিজন মেইনটেন্যান্স

আমাদের দেশে চার্জার ফ্যান মূলত বছরের ৪-৫ মাস ব্যবহার করা হয়। বাকি সময় এটি ঘরের এক কোণে পড়ে থাকে। মজার বিষয় হলো, ব্যবহারের চেয়ে অব্যবহৃত অবস্থায় থাকলে চার্জার ফ্যান বেশি নষ্ট হয়। লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি সচল রাখার শর্তই হলো এটি নিয়মিত চার্জ এবং ডিসচার্জ হতে হবে।

শীতকালে যখন ফ্যানের প্রয়োজন হয় না, তখনও মাসে অন্তত একবার ফ্যানটি বের করা উচিত। নিয়ম হলো মাসে একবার ফ্যানটি ফুল চার্জ দেওয়া এবং চার্জ হওয়ার পর সেটি আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা চালিয়ে নেওয়া। এতে ব্যাটারির ভেতরের ফ্লুইড বা কেমিক্যালগুলো সচল থাকে। আপনি যদি টানা ৪ মাস ফ্যানটি চার্জ না দিয়ে ফেলে রাখেন, তবে গরমের সময় যখন আবার এটি চালু করতে যাবেন, দেখবেন ব্যাটারি আর চার্জ নিচ্ছে না। তাই আপনি যদি অফ-সিজনে এই ছোট বিষয়টি অনুসরণ করেন তবে নতুন করে চার্জার ফ্যান কেনার খরচ বাঁচিয়ে দিবে। 

ব্যাটারির যত্ন ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ

চার্জার ফ্যান কোথায় চার্জ দিচ্ছেন বা কোথায় রাখছেন, সেটিও কিন্তু ব্যাটারির আয়ুর ওপর প্রভাব ফেলে।

১. তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: চার্জ দেওয়ার সময় ফ্যানটি এমন জায়গায় রাখুন যেখানে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে। খুব ছোট বা বদ্ধ জায়গায় চার্জ দিলে ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হতে পারে। রান্নাঘরের পাশে বা সরাসরি সূর্যের আলো পড়ে এমন জায়গায় ফ্যান রাখবেন না।

২. ধুলোবালি থেকে সুরক্ষা: ফ্যানের ব্লেড বা মোটরের ভেতর ধুলো জমলে মোটর ঘোরার সময় বেশি বাধার সম্মুখীন হয়। এতে ব্যাটারির ওপর অতিরিক্ত লোড পড়ে এবং চার্জ দ্রুত শেষ হয়। নিয়মিত শুকনো কাপড় দিয়ে ফ্যানটি পরিষ্কার রাখুন।

৩. ভোল্টেজ ওঠানামা: বাংলাদেশে অনেক এলাকায় ভোল্টেজের সমস্যা থাকে। ভোল্টেজ যদি খুব বেশি আপ-ডাউন করে, তবে সরাসরি দেয়ালের সকেটে চার্জ না দিয়ে একটি ভালো মানের মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করা নিরাপদ।

৪. সঠিক চার্জার ক্যাবল: ফ্যানের সাথে আসা অরিজিনাল চার্জার ক্যাবলটিই সবসময় ব্যবহার করুন। লোকাল ক্যাবল ব্যবহার করলে অনেক সময় সঠিক এম্পিয়ারে চার্জ হয় না, যা ব্যাটারির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে।

দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের জন্য কিছু প্রো-টিপস

আপনার প্রিয় চার্জার ফ্যানটিকে বছরের পর বছর নতুনের মতো সচল রাখতে নিচের টিপসগুলো মেনে চলুন:

  •  ফ্যানের ব্যাটারি যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে সেটি ফেলে না রেখে দ্রুত পরিবর্তন করে নিন। নষ্ট ব্যাটারি দীর্ঘক্ষণ চার্জে লাগিয়ে রাখলে ফ্যানের মেইন সার্কিট পুড়ে যেতে পারে।
  •  ফ্যানে যদি এলইডি লাইট থাকে, তবে অপ্রয়োজনে সেটি জ্বালিয়ে রাখবেন না। এতে ব্যাটারির ব্যাকআপ ফ্যানের বাতাসের জন্য বেশি সময় পাওয়া যাবে।
  •  রাতে ঘুমানোর সময় চার্জে দিয়ে রাখা এড়িয়ে চলুন, কারণ ঘুমের ঘোরে ফ্যানটি ফুল চার্জ হওয়ার পর প্লাগ খোলা সম্ভব হয় না, যা ওভারচার্জিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • যদি দেখেন ফ্যানটি চার্জ হতে অস্বাভাবিক বেশি সময় নিচ্ছে (যেমন ১২-১৪ ঘণ্টা), তবে বুঝবেন ব্যাটারি বা চার্জারে সমস্যা আছে। এমন অবস্থায় বিশেষজ্ঞ টেকনিশিয়ান দিয়ে চেক করিয়ে নিন।

শেষ কথা

চার্জার ফ্যান এই গরমে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে স্বস্তি নিয়ে আসে। সামান্য সতর্কতা আর চার্জ দেওয়ার সঠিক নিয়ম মেনে চললে এই ডিভাইসটি অনেক দিন পর্যন্ত আপনাকে শীতল হাওয়া দেবে। মনে রাখবেন, দামি ফ্যান কেনার চেয়ে সেটির সঠিক যত্ন নেওয়া বেশি জরুরি।

আশা করি আজকের এই গাইডটি আপনার চার্জার ফ্যানের আয়ু বাড়াতে সাহায্য করবে।

Similar Posts