ফোনের চার্জ তাড়াতাড়ি যায় কেন!

ফোনের চার্জ তাড়াতাড়ি যায় কেন!

একদিন অফিসে বসে কাজ করছি, হঠাৎ দেখি পাশের কলিগ রাজিব হুড়োহুড়ি করছে। বলল “ভাই, ফোনটা আবার বন্ধ হয়ে গেলো! সকালে ফুল চার্জ দিছিলাম!” এই কথাটা শুনে আমি হেসে ফেললাম। কারণ এই সমস্যাটা শুধু তার না, আমাদের প্রায় সবারই!  কাজ, কথা, ছবি তোলা, এমনকি ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সব কিছুতেই ফোন। কিন্তু সমস্যা হলো, ফোনের চার্জটা যেন আর টিকে না!

আসলে আমরা অনেক সময় না জেনেই এমন কিছু করি, যেগুলো মোবাইল ফোনের ব্যাটারির উপর প্রচণ্ড চাপ ফেলে। আজকের এই লেখায় আমি একদম সহজভাবে বলবো, ফোনের চার্জ আসলে কেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়, আর এই সমস্যা সমাধানে ঠিক কি কি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে সবকিছু।

ফোনের চার্জ দ্রুত শেষ হওয়ার সাধারণ কারণগুলো

আমাদের দীর্ঘদিনের এক্সপেরিয়েন্স থেকে দেখেছি, বেশিরভাগ মানুষ ভাবে “আমার ফোনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাই চার্জ টিকে না।” কিন্তু বাস্তবে ফোন খারাপ না, বরং আমাদের ইউজ করার কিছু অভ্যাসই ব্যাটারি লাইফ কমিয়ে দেয়।

১. Screen Brightness বেশি রাখা

আমরা অনেকেই স্ক্রিনের ব্রাইটনেস ফুল করে রাখি, বিশেষ করে বাইরে রোদে থাকলে। কিন্তু এটাই ব্যাটারির সবচেয়ে বড় শত্রু। স্ক্রিনের ব্রাইটনেস যত বেশি, চার্জ খরচ হবে তত দ্রুত। এক্ষেত্রে “Auto Brightness” অন করে রাখলে ফোন নিজে থেকেই আলো কম-বেশি করে নিতে পারে। তাছাড়া অপ্রয়োজনে স্ক্রিন অন রেখে দিলে চার্জ শেষ হয়ে যাবে। তাই স্ক্রিন টাইমআউট সময়টা ৩০ সেকেন্ডে থেকে ১ মিনিট রাখাই ভালো।

২. Background Apps 

বেশিরভাগ ইউজার জানেই না যে, ফোন বন্ধ করে রাখলেও অনেক অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে। যেমন: Facebook, Instagram, WhatsApp, বা Maps এর মতো অ্যাপগুলো সারাক্ষণ ডেটা আপডেট করতে থাকে, যার ফলে ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়। এর সমাধান হিসেবে Settings > Battery > Background Usage এ গিয়ে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাক্টিভিটি বন্ধ করে দিন। বিশেষ করে গেম বা মিডিয়া অ্যাপগুলোকে বন্ধ করলে ভালো একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করবেন।

৩. উইক নেটওয়ার্ক বা সিগন্যাল ইস্যু 

আমরা প্রায়ই এমন ইউজার দেখি যারা বলে, “আমি কিছুই করিনি, তারপরও চার্জ চলে যায়।” আসলে যখন ফোনের নেটওয়ার্ক সিগন্যাল দুর্বল থাকে, তখন সেটি নিজে থেকেই সিগন্যাল খুঁজতে থাকে, যা প্রচুর পাওয়ার কনজিউম করে। তাই যদি দেখেন নেটওয়ার্ক দুর্বল, তখন “Airplane Mode” অন করে Wi-Fi ব্যবহার করতে পারলে ভালো। এতে চার্জ অনেকটাই বাঁচবে।

৪. ব্লুটুথ, লোকেশন ও ওয়াইফাই সবসময় অন রাখা

আমাদের রিসার্চে দেখা গেছে, যারা সারাদিন Bluetooth, Wi-Fi, বা Location অন রাখে, তাদের ফোনে ব্যাটারি ২০–২৫% পর্যন্ত দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এই ফিচারগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্রমাগত কানেকশন খুঁজতে থাকে, যা ব্যাটারি নষ্টের অন্যতম কারণ। তাই অপ্রয়োজনে এগুলো বন্ধ রাখুন। আর প্রয়োজনে দ্রুত এক্সেসের জন্য কন্ট্রোল সেন্টার থেকে অন–অফ করাই যথেষ্ট।

৫. ব্যাটারি ইস্যু

কিছু কিছু ক্ষেত্রে  সমস্যাটা ফোনে নয়, বরং ব্যাটারিতে হয়ে থাকে। সময়ের সাথে সাথে ব্যাটারীর “সাইকেল কাউন্ট” পার হয়ে যায়, অর্থাৎ যত বেশি চার্জ করা হয়, ততই তার হেলথ কমতে থাকে। ফলে ফোন আর আগের মতো চার্জ ধরে রাখতে পারে না। এক্ষেত্রে Settings > Battery > Battery Health (iPhone) বা Battery Usage (Android) থেকে ব্যাটারি হেলথ চেক করে দেখুন। হেলথ ৮০% এর নিচে গেলে ব্যাটারি রিপ্লেস করার সময় এসেছে।

৬. চার্জিং অভ্যাস 

অনেকেই রাতে চার্জে লাগিয়ে ঘুমিয়ে যায়। এটা ব্যাটারির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাস। Overcharging ব্যাটারির লাইফটাইম কমিয়ে দেয়, এর ফলে ফোন গরমও হয়ে যায়। তাই সর্বদা  ৮০–৯০% পর্যন্ত চার্জ হলে খুলে ফেলুন। আর চার্জিং অবস্থায় ফোন অতিরিক্ত হিট হলে ফোনকে ঠাণ্ডা করে আবার চার্জে দিন। এক্ষেত্রে একটি ভালো মানের ফোন চার্জার ব্যাবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পরুনঃ- দ্রুত চার্জ দিতে ব্যবহার করবেন যে সকল চার্জার

ফোনের চার্জ দ্রুত শেষ হওয়া রোধে কার্যকর টিপস

প্রতিদিন একটু সচেতনভাবে ফোন ব্যবহার করলে চার্জের স্থায়িত্ব বেড়ে যাবে অনেকগুণ। সহজভাবে দেখে নিই কিছু প্র্যাকটিকাল টিপস, যেগুলো আমি নিজের মোবাইল ফোনেও ব্যবহার করি এবং ক্লায়েন্টদেরও সাজেস্ট করি।

১. স্ক্রিন টাইম ও ব্রাইটনেস 

যত কম সময় স্ক্রিন অন থাকবে, তত বেশি সময় চার্জ টিকবে। এটা একদম সহজ বিষয়। অনেকেই ভিডিও দেখার পর স্ক্রিন বন্ধ না করেই ফোন ফেলে রাখে, এতে ব্যাটারির চার্জ অপ্রয়োজনেই খরচ হয়ে যায়।

২. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন

প্রতিটি নোটিফিকেশন মানে ফোনের জন্য একটা ছোট ওয়েক আপ কল। এই ব্যাকগ্রাউন্ড নোটিফিকেশন ব্যাটারির চার্জ কমানোর জন্য অন্যতম একটা কারন। এর সমাধান হিসেবে Settings > Notifications এ গিয়ে যেসব অ্যাপের নোটিফিকেশন দরকার নেই, সেগুলো বন্ধ করে দিন। এতে আপনার ব্যাটারি লাইফে  বেশ পরিবর্তন দেখতে পারবেন। 

৩. ব্যাটারি সেভার মোড ব্যবহার করুন 

বেশিরভাগ ফোনেই এখন “Battery Saver” বা “Power Saving Mode” ফিচার থাকে। এই মোড অন করলে ব্যাটারি ১৫–২০% কম পাওয়ার কনজিউম করে। সাজেশন হিসেবে বলছি,  যখন দেখবেন ব্যাটারি ৩০% এর নিচে, তখন সঙ্গে সঙ্গে ব্যাটারি সেভার অন করে নিবেন। এতে ফোন নিজেই ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ বন্ধ করে দেয়। এক্ষেত্রে পারফরম্যান্স কিছুটা কমলেও চার্জ অনেক বেশি টিকে।

৪. উইক নেটওয়ার্কে ডেটা অফ রাখুন

যখন নেটওয়ার্ক সিগন্যাল দুর্বল থাকবে, তখন ফোন ক্রমাগত কানেকশন খুঁজে বেড়ায়। এটা চার্জ খাওয়ার অন্যতম বড় কারণ। তাই দুর্বল নেটওয়ার্ক এলাকায় থাকলে ডেটা বন্ধ রেখে সম্ভব হলে Wi-Fi ব্যবহার করুন। এতে ফোন ঠান্ডাও থাকবে, চার্জও সাশ্রয় হবে।

৫. অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ আনইনস্টল করো

অনেকের ফোনে ৮০–৯০টা অ্যাপ থাকে, কিন্তু ব্যবহার হয় মাত্র ১০টা! এসব অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে ডেটা নেয়, প্রসেস চালায়, আর চার্জ খেয়ে ফেলে। তাই প্রতি সপ্তাহে একবার ফোন চেক করে দেখুন যে, কোন অ্যাপগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না। এসব অ্যাপ আনইনস্টল করে ফেললে ফোন স্মুথ চলবে আর চার্জও টিকবে বেশি।

৬. ব্যাটারি ক্যালিব্রেশন করুন

এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা অনেকেই জানে না। আমাদের ল্যাব টেস্টে দেখা গেছে, মাঝে মাঝে ব্যাটারি ক্যালিব্রেট করলে ফোনের চার্জ ধরে রাখার ক্ষমতা অনেকটাই ঠিক থাকে। ব্যাটারি ক্যালিব্রেট করতে একবার ফোনের চার্জ পুরোপুরি শেষ (০%) হতে দিন। তারপর একটানা ১০০% পর্যন্ত চার্জ করুন। এভাবে মাসে একবার করলে ব্যাটারি হেলথ অনেক ভালো থাকবে।

আরও পরুনঃ- স্মার্টফোন চার্জ না হওয়ার কারণ

৭. ফার্মওয়্যার ও অ্যাপ আপডেট করুন

পুরনো সফটওয়্যারে অনেক সময় ব্যাটারি অপটিমাইজেশনের সমস্যা থাকে। ফোন আপডেট করলে অনেক সময় চার্জ ফুরানোর সমস্যা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। এক্ষেত্রে Settings > Software Update এ গিয়ে ফোন আপডেট করে নিন। এছাড়া পুরনো ভার্সনের অ্যাপগুলোও আপডেট করে নিন।

৮. ওভারহিটিং ইস্যু

ফোন গরম হলে ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হয় – এটা প্রমাণিত সত্য। গেম খেলার সময় বা চার্জে লাগিয়ে ইউটিউব দেখলে ফোন অতিরিক্ত গরম হয়, যা ব্যাটারির জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। তাই বলবো, ফোন যদি গরম মনে হয়, তাহলে কয়েক মিনিটের জন্য বন্ধ করে কুল জায়গায় রাখুন। এতে কিছুক্ষণ পর ব্যাটারি আবার স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসবে।

কিছু সমাধান 

যদি আপনার ফোনে ঠিকমতো চার্জ নেয়, হঠাৎ বন্ধ হয় না, শুধু একটু দ্রুত চার্জ শেষ হয়, তাহলে ব্যাটারি রিপ্লেস করলেই সমস্যা সমাধান পাবেন। অনেক সময় ফোন ২–৩ বছর পুরনো হলেও নতুন ব্যাটারি লাগালে পারফরম্যান্স আগের মতো হয়ে আসে। 

তবে, যদি ফোনের বয়স ৩-৪ বছরের বেশি হয় আর ব্যাটারি বারবার চার্জ করার পরেও, ফোন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, এমন ক্ষেত্রে ব্যাটারি বার বার রিপ্লেস করলে খরচ বাড়বে, কিন্তু কার্যকরী পরিবর্তন খুব বেশি দেখা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন ফোন নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। 

আর তাই আপনার স্বপ্নের স্মার্টফোনটি কেনার সেরা জায়গা এখন Apple Gadgets। আমাদের কাছে পাবেন ১০০% অরিজিনাল ও ব্র্যান্ড নিউ স্মার্টফোন – লেটেস্ট মডেল, অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি, এবং আকর্ষণীয় দাম সব একই জায়গাতেই। 

চলুন আজই দেখে নিন কোন ফোনটি আপনার জন্য পারফেক্ট। ভিজিট করুন Apple Gadgets

উপরের আলোচনা থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট – ফোনের চার্জ টিকবে কিনা, সেটা অনেকটাই নির্ভর করে একজন ইউজারের ইউজিং হ্যাবিটের উপর। ফোন বা ব্র্যান্ড যত ভালোই হোক, যদি সারাক্ষণ ফুল ব্রাইটনেস, ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ, আর রাতভর চার্জে রাখার অভ্যাস থাকে, তাহলে ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হবেই। অন্যদিকে, একটু সচেতনভাবে ব্যবহার করলে ফোনের চার্জ আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় টিকবে। উপরের মাত্র ৩-৪টা ছোট অভ্যাস বদলালেই ফোনের ব্যাটারি লাইফে বিশাল পরিবর্তন দেখতে পাবেন। 

FAQs

আমার ফোন নতুন, তারপরও চার্জ দ্রুত শেষ হয়ে যায় কেন?

অনেক সময় নতুন ফোনেও ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা অ্যাপ, হাই ব্রাইটনেস বা উইক নেটওয়ার্কের কারণে চার্জ দ্রুত শেষ হয়। তাছাড়া প্রথম কয়েকদিনে ফোন অনেক ডেটা সিঙ্ক করে (অ্যাপ আপডেট, ক্লাউড ব্যাকআপ ইত্যাদি), এগুলোও বেশি চার্জ খরচ করে।

 রাতে ফোন চার্জে রেখে ঘুমানো কি ক্ষতিকর?

হ্যাঁ, দীর্ঘ সময় ১০০% চার্জ অবস্থায় প্লাগ ইন থাকলে ব্যাটারির হেলথ অনেক অমে যায়। তাই ওভারচার্জ না করতে চাইলে ৮০–৯০% পর্যন্ত চার্জ হয়ে গেলে খুলে ফেলাই ভালো।

“Battery Saver” মোড অন রাখলে কি ফোনের পারফরম্যান্স কমে যায়?

হালকা কমে, তবে এটি সাময়িক। ব্যাটারি সেভার মোড মূলত ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস ও কিছু ভিজ্যুয়াল অ্যানিমেশন বন্ধ বা লিমিটেড করে দেয়। তাতে পারফরম্যান্সে সামান্য প্রভাব পড়লেও চার্জ অনেক বেশি টিকে।

ব্যাটারি হেলথ কিভাবে চেক করবো?

iPhone এর ক্ষেত্রে Settings > Battery > Battery Health & Charging আর Android এ Settings > Battery > Battery Usage থেকে ব্যাটারি হেলথ বা চার্জিং পারফরম্যান্স দেখা যাবে।

চার্জ দ্রুত শেষ হলে কি ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হবে?

সবসময় ব্যাটারি রেপ্লেস জরুরি নয়। আগে সফটওয়্যার ও ইউজিং হ্যাবিট ঠিক করুন। যদি এরপরও সমস্যা থেকে যায়, আর ব্যাটারি হেলথ ৮০% এর নিচে নামে, তখন ব্যাটারি রিপ্লেস করাই উত্তম সমাধান।

Similar Posts