এয়ার ফ্রায়ার কেনার আগে যা জানা জরুরি

এয়ার ফ্রায়ার কেনার আগে যা জানা জরুরি

আজকের ব্যস্ত লাইফস্টাইলে সুস্বাদু আর স্বাস্থ্যকর রান্না এই দুইয়ের ব্যালান্স রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ভাজাপোড়া খেতে মন চাইলেও অতিরিক্ত তেল, রান্নার ঝামেলা আর সময়ের অভাবে ইচ্ছেটা অপূর্ণই থেকে যায়। ঠিক এখানেই এয়ার ফ্রায়ার আমাদের কিচেন লাইফটা অনেক সহজ করে দিয়েছে।

তবে বাজারে ঢুকলেই দেখা যাবে- ব্র্যান্ড, ক্যাপাসিটি, ওয়াটেজ, ডিজিটাল কন্ট্রোল, মাল্টিপল কুকিং মোড ছাড়াও আরো নানান অপশন যেন শেষই হয় না। আজকের আর্টিকেলে আমরা ঠিক সেটাই সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করবো।

এয়ার ফ্রায়ার কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে

এয়ার ফ্রায়ার মূলত একটি স্মার্ট কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স, যেটি খুব কম তেল ব্যবহার করে খাবারকে ফ্রাই, বেক বা গ্রিল করতে পারে। বাইরে থেকে দেখতে এটি ছোট একটি ওভেনের মতো হলেও ভেতরের কাজ করার পদ্ধতিটা বেশ আলাদা। এখানে খাবার রান্না হয় মূলত গরম বাতাসের মাধ্যমে, যেখানে তেলের ব্যবহার থাকে একেবারেই সীমিত।

সাধারণ ফ্রাইং পদ্ধতিতে খাবার ডুবিয়ে রাখতে হয় প্রচুর গরম তেলে, কিন্তু এয়ার ফ্রায়ারে খাবার রাখা হয় একটি বাস্কেট বা ট্রেতে। এরপর নির্দিষ্ট টেম্পারেচার ও টাইম সেট করে দিলেই ডিভাইসটি নিজে থেকেই রান্নার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। 

এয়ার ফ্রায়ারের মূল কাজ করার টেকনোলজি হলো Rapid Air Technology। এই টেকনোলজিতে এয়ার ফ্রায়ারের ভেতরে থাকা শক্তিশালী হিটিং এলিমেন্ট খুব দ্রুত বাতাসকে গরম করে এবং একটি হাই-স্পিড ফ্যান সেই গরম বাতাসকে খাবারের চারপাশে সমানভাবে ঘুরিয়ে দেয়।

এই দ্রুত ঘূর্ণায়মান গরম বাতাস খাবারের বাইরের অংশে একটি ক্রিসপি লেয়ার তৈরি করে, ঠিক যেমনটা ডিপ ফ্রাই করলে হয়। পার্থক্য হলো এখানে অতিরিক্ত তেল লাগে না। এয়ার ফ্রায়ারে রান্নার সময় গরম বাতাস খাবারের চারপাশে 360 ডিগ্রি ঘুরতে থাকে। এর ফলে তাপ সরাসরি খাবারের উপর পড়ে এবং খুব অল্প সময়েই খাবার সমানভাবে সেদ্ধ ও ব্রাউন হয়। অনেক মডেলে টেম্পারেচার ও টাইম খুব নিখুঁতভাবে কন্ট্রোল করা যায়, যেখানে আপনি চাইলে আপনার পছন্দমতো রান্না করতে পারবেন।

এয়ার ফ্রায়ারকে তুলনামূলকভাবে হেলদি বলা হয় মূলত কম তেল ব্যবহারের কারণে। সাধারণ ফ্রাই করা খাবারে যেখানে 70–80% পর্যন্ত তেল শোষিত হয়, সেখানে এয়ার ফ্রায়ারে মাত্র এক চামচ তেল বা কখনও তেল ছাড়াই রান্না করা সম্ভব।

এয়ার ফ্রায়ারের ধরন (Air Fryer Types)

এয়ার ফ্রায়ার কেনার সময় প্রথম যে বিষয়টি বোঝা দরকার, সেটি হলো এর ধরন। সব এয়ার ফ্রায়ার দেখতে একরকম হলেও ব্যবহার, ক্যাপাসিটি আর কুকিং স্টাইলের দিক থেকে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। সাধারণত বাজারে যে তিন ধরনের এয়ার ফ্রায়ার বেশি দেখা যায়, সেগুলো নিচে সহজ করে ব্যাখ্যা করা হলোঃ 

Basket Type Air Fryer

Basket Type Air Fryer হলো সবচেয়ে কমন এবং জনপ্রিয় এয়ার ফ্রায়ার টাইপ। এতে একটি ডিপ বাস্কেট থাকে, যেখানে খাবার রেখে রান্না করা হয়। ব্যবহার পদ্ধতি খুবই সহজ- খাবার রাখুন, টেম্পারেচার ও টাইম সেট করুন, ব্যাস। চিকেন ফ্রাই, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, নাগেটস বা ফ্রোজেন স্ন্যাক্স রান্নার জন্য এটি বেশ কার্যকর। 

Oven Style / Digital Air Fryer

Oven Style বা Digital Air Fryer দেখতে অনেকটা ছোট ইলেকট্রিক ওভেনের মতো। এতে সাধারণত সামনে একটি গ্লাস ডোর থাকে এবং ভেতরে একাধিক ট্রে বা র‍্যাক ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। ফলে একসাথে একাধিক আইটেম রান্না করা যায়।

এই টাইপের এয়ার ফ্রায়ারে মাল্টিপল কুকিং মোড থাকে, যেমনঃ Bake, Grill, Roast এমনকি Dehydrate অপশনও অনেক মডেলে পাওয়া যায়। যারা কেক, পিজ্জা বা বড় সাইজের খাবার রান্না করতে চান, তাদের জন্য Oven Style Air Fryer বেশ উপযোগী।

Dual Basket Air Fryer

Dual Basket Air Fryer তুলনামূলকভাবে নতুন একটি মডেল, যেখানে একই ডিভাইসে দুইটি আলাদা বাস্কেট থাকে। প্রতিটি বাস্কেটে আলাদা খাবার, আলাদা টেম্পারেচার ও আলাদা টাইম সেট করা যায়।

এর বড় সুবিধা হলো একই সময়ে দুই ধরনের খাবার রান্না করা সম্ভব। ব্যস্ত পরিবারের জন্য বা যারা একসাথে মেইন ডিশ আর সাইড ডিশ রান্না করতে চান, তাদের কাছে Dual Basket Air Fryer বেশ সময় বাঁচানো একটি সলিউশন।

ক্যাপাসিটি বাছাই করবেন কীভাবে

এয়ার ফ্রায়ার কেনার সময় ক্যাপাসিটির বিষয়টা লক্ষ রাখা বেশ জরুরি। ২-৩  লিটার ক্যাপাসিটি সাধারণত সিঙ্গেল ইউজার বা কাপলের জন্য উপযোগী। যারা মাঝে মাঝে এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহার করবেন, তাদের জন্য এটি একটি কমপ্যাক্ট অপশন।

এরপর আসে ৪-৫ লিটার ক্যাপাসিটি, যা ছোট ফ্যামিলির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় চয়েস। এতে ৩–৪ জনের জন্য একবারে পর্যাপ্ত খাবার রান্না করা যায় এবং ডেইলি কুকিংয়ের ক্ষেত্রেও এটি বেশ সুবিধাজনক। এছাড়া বড় পরিবার বা যাদের একসাথে বেশি পরিমাণ খাবার রান্নার দরকার তাদের জন্য ৬ লিটার বা তার বেশি ক্যাপাসিটি ভালো হবে। 

তবে মনে রাখবেন এয়ার ফ্রায়ারে Overload করা ঠিক নয়। বাস্কেট বেশি ভরে ফেললে গরম বাতাস ঠিকমতো ঘুরতে পারে না, ফলে খাবার সমানভাবে রান্না হয় না। এতে একদিকে কিছু অংশ কাঁচা থেকে যেতে পারে, আবার অন্য অংশ বেশি শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। তাই সবসময় ক্যাপাসিটির মধ্যে থেকে খাবার রান্না করাই ভালো।

ওয়াটেজ ও পাওয়ার কনজাম্পশন

এয়ার ফ্রায়ার সাধারণত 1200W থেকে 1800W রেঞ্জের মধ্যে হলে ভালো পারফরম্যান্স দেয়। কম ওয়াটেজে রান্না করতে সময় একটু বেশি লাগতে পারে, আর বেশি ওয়াটেজে খাবার দ্রুত রান্না হলেও পাওয়ার কনজাম্পশন তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। তাই এখানে একটু ব্যালান্স করা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ খরচ ও অন্যান্য বিষয় চিন্তা করলে 1200W থেকে 1800W রেঞ্জের এয়ার ফ্রায়ারগুলো বেশ উপযোগী।

আরও পরুনঃ- কোন ব্র্যান্ডের ওভেন ভালো

টেম্পারেচার ও টাইম কন্ট্রোল সিস্টেম

এয়ার ফ্রায়ারে ভালো রান্নার জন্য টেম্পারেচার কন্ট্রোলের পাশাপাশি টাইম কন্ট্রোলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইটি ঠিকভাবে ব্যালান্স না হলে খাবারের টেস্ট ও টেক্সচার দুটোই প্রভাবিত হয়।

Manual Knob বনাম Digital Touch Panel

Manual Knob এয়ার ফ্রায়ারে টেম্পারেচার ও টাইম সাধারণত দুটি আলাদা নোব ঘুরিয়ে সেট করতে হয়। এটি ব্যবহার করা সহজ হলেও টাইম সেটিং কিছুটা অনুমাননির্ভর হয়। অন্যদিকে Digital Touch Panel এয়ার ফ্রায়ারে নির্দিষ্ট টেম্পারেচার ও টাইম সেট করা যায়, ফলে রান্না বেশি কন্ট্রোলডভাবে হয়। বিশেষ করে বেকিং বা ফ্রোজেন ফুড রান্নার ক্ষেত্রে ডিজিটাল টাইম কন্ট্রোল বেশ কাজে আসে।

Preset Cooking Mode-এর সুবিধা

Preset Cooking Mode থাকলে টেম্পারেচার ও টাইম দুটোই আগে থেকেই সেট করা থাকে। ফ্রাই, চিকেন, ফিশ, কেক বা ফ্রোজেন ফুডসহ এই ধরনের যেকোনো প্রিসেট অপশন সিলেক্ট করলেই ডিভাইস নিজে থেকেই উপযুক্ত টেম্পারেচার ও টাইম সেট করে নেয়। এতে রান্নার সময় বারবার চেক করার ঝামেলা থাকে না।

Accurate Temperature ও Time Control কেন জরুরি

Accurate Temperature Control যেমন দরকার, তেমনি Accurate Time Contol না থাকলে খাবার আন্ডারকুক বা ওভারকুক হয়ে যেতে পারে। সময় কম হলে খাবার ভেতর থেকে সেদ্ধ হয় না, আর বেশি হলে খাবার শুকিয়ে যায়। সঠিক টাইম কন্ট্রোল থাকলে খাবার ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকুই রান্না হয়। তাই ভালো মানের এয়ার ফ্রায়ারে টেম্পারেচার ও টাইম দুটো কন্ট্রোলই একুরেট সেট করার অপশন থাকে। 

কুকিং ফিচার ও মাল্টিপল মোড

আধুনিক এয়ার ফ্রায়ারগুলোর বিভিন্ন কুকিং ফিচার ও মাল্টিপল মোড থাকার কারণে একটাই ডিভাইসে নানারকম রান্না করা সম্ভব। 

Fry, Bake, Grill, Roast

এই চারটি কুকিং মোড প্রায় সব ভালো মানের এয়ার ফ্রায়ারেই দেখা যায়। 

  • Fry মোডে খুব কম তেলে খাবার ক্রিসপি করা যায়।
  • Bake মোড কেক, পিজ্জা বা ব্রেড টাইপ আইটেমের জন্য উপযোগী। 
  • Grill মোডে চিকেন, ফিশ বা কাবাব সুন্দরভাবে সেঁকা যায়। 
  • Roast মোড বড় সাইজের খাবার বা পুরো চিকেন রান্নার ক্ষেত্রে ভালো ফল দেয়। 

এই মাল্টিপল মোডগুলো থাকার ফলে আলাদা আলাদা অ্যাপ্লায়েন্সের দরকার পড়ে না।

Frozen Food Mode

Frozen Food Mode মূলত ফ্রোজেন আইটেম দ্রুত রান্নার জন্য ডিজাইন করা। ফ্রোজেন নাগেটস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিকেন উইংস রান্নার সময় এই মোড নিজে থেকেই উপযুক্ত টেম্পারেচার ও টাইম সেট করে নেয়। ফলে খাবার বাইরে থেকে বেশি শক্ত না হয়ে ভেতরটা ঠিকভাবে সেদ্ধ হয়।

Reheat ও Keep Warm অপশন

Reheat অপশন আগের রান্না করা খাবার আবার গরম করার জন্য বেশ কার্যকর। এতে খাবার শুকিয়ে না গিয়ে আগের মতোই টেস্ট ও টেক্সচার ধরে রাখে। আর Keep Warm অপশন রান্না শেষ হওয়ার পর খাবার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত গরম রাখে।

Inner Basket ও Build কোয়ালিটি

এয়ার ফ্রায়ারের Inner Basket ও সামগ্রিক Build Quality সরাসরি ইউজার এক্সপেরিয়েন্সের সঙ্গে জড়িত। বাস্কেটে ভালো মানের Non-stick Coating থাকলে খাবার লেগে যায় না এবং পরিষ্কার করাও সহজ হয়। পাশাপাশি Food Grade Material ব্যবহার করা হলে খাবারের স্বাদ ও স্বাস্থ্য দুটোই নিরাপদ থাকে। অনেক মডেলে বাস্কেট Dishwasher Safe হওয়ায় ডেইলি ক্লিনিং বেশ সুবিধাজনক।

সেফটি ফিচারগুলো নজরে রাখবেন

একটি ভালো এয়ার ফ্রায়ারে সেফটি ফিচার থাকা খুবই জরুরি Auto Shut-off ফিচার থাকলে বাস্কেট খুললে বা রান্না শেষ হলে ডিভাইস নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। Overheat Protection অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে মেশিনকে সুরক্ষা দেয়। Cool Touch Handle থাকলে হাত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে, আর 

ডিজাইন ও কিচেন স্পেস

এয়ার ফ্রায়ার কেনার সময় এর ডিজাইন ও কিচেন স্পেসের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা উচিত। Compact Design হলে ছোট কিচেনেও সহজে সেট করা যায় এবং Countertop Friendly Size হওয়ায় আলাদা জায়গার দরকার পড়ে না। এছাড়া Noise Level খুব বেশি না হলে রান্নার সময় বিরক্তি লাগবে না।

ওয়ারেন্টি ও আফটার সেলস সাপোর্ট

এয়ার ফ্রায়ার কেনার সময় ওয়ারেন্টি ও আফটার সেলস সাপোর্টের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। Brand Warranty থাকলে আপনি নিশ্চিত থাকবেন যে যেকোনো মেশিন ইস্যুতে ব্র্যান্ড নিজেই সমাধান দেবে। এছাড়াও Service Availability দেখবেন অর্থাৎ ব্র্যান্ডের সার্ভিস সেন্টার থেকে যেন যেকোনো সমস্যা দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়। 

আপনিও যদি ট্রাস্টেড ব্র্যান্ড ও আফটার সেলস সাপোর্ট সহ এয়ার ফ্রায়ার কিনতে চান, তাহলে Apple Gadgets-এ আপনি পেয়ে যাবেন প্রিমিয়াম মানের প্রোডাক্টের সঙ্গে নিশ্চিত সার্ভিস। এখনই ভিজিট করুন Apple Gadgets এবং আপনার কিচেনের জন্য সেরা এয়ার ফ্রায়ার বেছে নিন!

পরিশেষে

এয়ার ফ্রায়ার আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায় কিচেনের এক অব্যর্থ সঙ্গী। এটি শুধু ফ্রাই করার জন্য নয়, বেক, গ্রিল, রোস্ট বা রিহিট করার মতো মাল্টিপল কুকিং মোড থাকায় আপনি আপনার চাহিদামতো রান্না করতে পারবেন এটি দিয়ে।। সঠিক ক্যাপাসিটি, যথাযথ ওয়াটেজ, নিখুঁত টেম্পারেচার ও টাইম কন্ট্রোল, Inner Basket ও Build Quality, সেফটি ফিচার, কিচেনের স্পেস অনুযায়ী ডিজাইন এবং শক্তিশালী ওয়ারেন্টি- এই সব দিক মাথায় রেখে যদি এয়ার ফ্রায়ার বাছাই করা হয়, তাহলে এটি আপনার ডেইলি কুকিং এক্সপেরিয়েন্সকে স্বাস্থ্যকর ও ঝামেলামুক্ত করে তুলবে, এবং আপনার জীবনকে করবে সহজ। 

Similar Posts